সুদীপ চক্রবর্তী নিয়ে একটা ঘটনা শেয়ার করি।
২০২৩ সালে আমার বাম পায়ে একবার হ্যামস্ট্রিং ইঞ্জুরি হয়। এই ইঞ্জুরি যখন একটু রিকোভারির দিকে যাচ্ছিলো তখনই বাইক এক্সিডেন্ট করে হাঁটু, কনুই ছিলে যাওয়া সহ হ্যামস্ট্রিংটা পুনরায় ছিঁড়ে গিয়েছিলো। এক্সিডেন্টের পরের দিন সকাল ৯টায় উনার ক্লাস ছিলো। পিএইচডি শেষে বিদেশফেরত একজন শিক্ষকের নিয়মকানুন, নীতিকথা শুনে ভালো লাগতো বলে অসুস্থতা সহ হাতেপায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে ক্লাসে গিয়েছিলাম৷ হ্যামস্ট্রিংয়ের জন্য হাটু ভাজ করতে না পারায় কলাভবনের লিফটের সামনের লম্বা সিরিয়াল ধরে ক্লাসে ঢুকে দেখলাম আমার দুই মিনিট দেরি হয়েছে। উনি শারীরিক অবস্থা দেখে জানতে চাইলেন আমার কি হয়েছে। ঘটনা শুনে বললেন, "ঠিকাছে বুঝলাম, কিন্তু আপনি তো ক্লাসে দুই মিনিট লেইট! একবার ভাবুন তো, আপনার যদি এইসময় ফ্লাইট থাকতো, আপনার জন্য কি প্লেন দুইমিনিট লেইট করতো? কিংবা ট্রেন দুইমিনিট দাঁড়িয়ে থাকতো?" যেহেতু তখন উনাকে আদর্শবান মানুষ হিসেবে মানি তাই অনেক শ্রদ্ধাও করি, , অসুস্থতা ভুলে গিয়ে আমার মনে হলো উনিই ঠিক। সর্বোচ্চ বিনয়ের সাথে দুঃখ প্রকাশ করলাম, উনি ক্লাস করার অনুমতি দিলেন।
এই ঘটনার ২সপ্তাহ পর উনার সাথে আবার আমাদের ক্লাস চলছিলো, হঠাৎ আমার একজন মেয়ে সহপাঠী হড়বড়িয়ে রুমে প্রবেশ করলো, আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে ২২ মিনিট দেরি করে ক্লাসে এসেছে। ভাবলাম স্যার হয়তো ক্লাস করার অনুমতি দিবেন না। অথচ দুই সপ্তাহ আগে দুই মিনিটের জন্য ট্রেন, প্লেনের বয়ান দেয়া শিক্ষক আমার এই সহপাঠীকে একটা শব্দও বললেন না! আমি খুবই অবাক হলাম! দুই জনের প্রতি দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখে, উনাকে নিয়ে আমার মাথায় যে ধারণাগুলো ছিলো মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো! উনার নীতি নৈতিকতা কতখানি শক্তিশালী সেসব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে লাগলো।
সেদিন ক্লাস শেষের আগে প্রশ্ন করতে বলায় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার আমাদের ক্লাস রুটিনটা আসলে কেনো করা হয়? উনি প্রশ্ন বুঝলেন না, আমি বুঝিয়ে বললাম রুটিন অনুযায়ী আপনার ক্লাস ৯টায় শুরু হয়ে ৯ঃ৫০ অবধি চলার কথা, তারপর আবার ১০ টায় শুরু হয়ে ১০ঃ৫০ এ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা তো মাঝখানে ২০ মিনিট ব্রেক পাওয়ার কথা কিন্তু সেটা পাইনি আর এখন সাড়ে এগারোটার উপরে বাজে। উনি বললেন, "হ্যাঁ তো? আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন?" আমি বললাম, স্যার যেহেতু রুটিন অনুযায়ী ২০মিনিটের ব্রেক আমরা আপনার কাছে পাইনি তাহলে রুটিনটা কেনো করা হয়? আর স্যার, ক্লাস শুরুর সময় আমার দুই মিনিট দেরিতে আসায় যদি ট্রেন, প্লেন চলে যায়; তাহলে আপনার এই ক্লাসের পরেও তো আমার ট্রেন, প্লেন বা অন্য কোনো কাজ থাকতে পারে। সেটা তো এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য আমার মিস হয়ে যেতে পারে, নিয়ম মানতে হলে বা শেখাতে হলে তো আপনার সবটাই মানা উচিত স্যার! এই কথার পর ক্লাসের সবকিছু সাথে সাথে একদম নিরব হয়ে গেলো। উনি নিজেকে সামলে নিয়ে ক্লাস শেষ করে চলে গেলেন।
এরপর থেকে শুরু হলো আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা। ক্লাসে, বাহিরে সবজায়গায় এর প্রতিক্রিয়া আমি লক্ষ্য করেছি। ধীরে ধীরে আসল চেহারাটা আমার কাছে আরো পরিষ্কার হলো তাই এসব নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাই নি, উনার কাছে এর থেকে ভালো কিছু আশা করিনি বলে নত ও হইনি। একদিন খেয়াল করলাম ফেসবুক আইডি থেকে আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছেন। অবাক না হয়ে আমিও ব্লক মেরে দিলাম। এরপর রেপার্টরি থিয়েটার আর প্রচারণা নিয়ে গবেষণা করেছি বলে আমার সুপারভাইজার, কোর্স শিক্ষকের পরামর্শে উনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম দুইবার।
আমি আমার গন্তব্যের জন্য সবসময় আল্লাহর কাছে চেয়েছি, তিনি আমাকে যেভাবে যা দিয়েছেন আমি খুশি হয়েছি। তবু কিছু ব্যাপার মনে থেকে গেছে, সেই ঘটনার পর সুদীপ চক্রবর্তীর সাথে আমি যতগুলো কোর্স পেয়েছি মিডটার্ম থেকে মূল পরীক্ষায় নাম্বার পেতে অন্য কোর্সের তুলনায় অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, তবুও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট আসেনি। যেহেতু প্রামাণিক দলিল নাই, ধরে নিয়েছি আমারই পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। শুধু চেয়েছি আমার সাথে ইচ্ছাকৃত অবিচার হয়ে থাকলে আল্লাহ যেনো এই হিসাবটা রাখেন।
পড়াশোনা করাকালীনই এতটুকু বুঝেছিলাম, ছোট একটা বিভাগে কার সাথে কার কেমন সম্পর্ক, কোথায় কোন আক্রোশ আছে সে অনুযায়ী এখানে অনেককিছু বিবেচনা হয়। যার জন্য শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদেরও নানান লেয়ারের সম্পর্ক গড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সম্পর্কগুলো নৈতিকতা হারালেই তখন সে সুযোগ থেকেই গতকালের মতো ঘটনাগুলো ঘটে। তারপরও যদি কারো টনক না নড়ে তাহলে তারজন্য আক্ষেপ করা ছাড়া কিছু বলার নাই। যদি জ্ঞান থাকে এই ঘটনা থেকে দুই পক্ষকেই অনৈতিক সবকিছু বর্জন করার আহবান জানাই। সুস্থ পড়াশোনা, সুস্থ নাম্বারিং, সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার আহবান জানাই।